২০০6 সালে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কার প্রদান করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস ও গ্রামীণ ব্যাংককে। তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান দেওয়া হয়েছিল। কমিটি সেসময় জানিয়েছিল দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সুযোগ ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, আর ক্ষুদ্রঋণ তেমনই এক পরিবর্তন-সক্ষম হাতিয়ার।
পুরস্কার ঘোষণার সময় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, তিন দশক আগে মুহাম্মদ ইউনুস যে ক্ষুদ্রঋণের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তা তখন প্রায় অসম্ভব বলেই বিবেচিত ছিল। আর্থিক জামানত ছাড়া দরিদ্র মানুষকে ঋণ দেওয়া প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধারণাতেই ছিল না। কিন্তু ছোট পরিসরে শুরু করা সেই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ পরবর্তীতে কোটি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছিল।

গ্রামীণ ব্যাংক শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী মাইক্রোফিন্যান্স মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নোবেল কমিটি তাদের বক্তব্যে জানিয়েছিল “পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে, এবং গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে যে দরিদ্রতম মানুষও নিজেদের উন্নয়নের পথ নিজেরাই তৈরি করতে পারে।”
১০ ডিসেম্বর ২০০৬-এ অসলো সিটি হলে অনুষ্ঠিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন মোছা. তসলিমা বেগম। এই ঘটনা ছিল নোবেল ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রথমবারের মতো কোনো উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র গ্রামীণ নারী নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন।
তসলিমা বেগম তখন গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচিত বোর্ড সদস্য ছিলেন। তাকে কেন্দ্র করে সহকর্মীদের আস্থা, নেতৃত্বগুণ এবং উন্নয়নমূলক কাজের কারণে তিনি সেন্টার চিফ থেকে শুরু করে শাখা প্রতিনিধি, আঞ্চলিক প্রতিনিধি এবং বোর্ড সদস্য পর্যন্ত উঠে এসেছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ইউনিট চিফরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনিই ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব করবেন নোবেল মঞ্চে। তসলিমা বেগম পরে বলেন, “আমরা স্বনির্ভর হয়েছি। গ্রামীণ ব্যাংক আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। ইউনুস স্যার গ্রামের মানুষের জন্য একটি ছাতা; আমার মতো নারীদের জন্য আইকন।” তার দুই সন্তানও তার উন্নয়নের সুফল পেয়েছিল বড় ছেলে আশরাফুল হক স্থানীয় পুলিশ বিভাগে যোগ দেন এবং ছোট ছেলে আবুল আওয়াল সিয়াম চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রি এশিয়ান ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা শুরু করে।
বিবৃতিতে নোবেল কমিটি বলেছিল যে, নারীকে উন্নয়নের মূলধারার বাইরে রেখে কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা গণতন্ত্রই পূর্ণতা পায় না। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নারীদের আর্থিক ও সামাজিক মুক্তির এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিল। নোবেল কমিটি আরও জানিয়েছিল, যদিও ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য দূরীকরণের একমাত্র উপায় নয়, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুহাম্মদ ইউনুসের লক্ষ্য ছিল একটি দারিদ্র্যহীন পৃথিবী তৈরি করা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা রেখেছিল।
২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার শুধু একটি প্রতিষ্ঠান বা একজন মানুষকে সম্মানিত করেনি এটি স্বীকৃতি দিয়েছিল তৃণমূল উন্নয়নের শক্তিকে। গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনুসের উদ্যোগ বিশ্বকে দেখিয়েছিল, সত্যিকারের পরিবর্তন শুরু হয় নিচ থেকে।
All Photo Credit : The Nobel Foundation



